ডলারের বিপরীতে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে এশীয় দেশগুলোর মুদ্রা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে থাকবে মুদ্রার বিনিময় হার সংক্রান্ত চুক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে থাকবে মুদ্রার বিনিময় হার সংক্রান্ত চুক্তি। বিনিয়োগকারীদের এমন ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে গতকাল এশীয় বেশ কয়েকটি মুদ্রার বিনিময় হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

এফটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, গত কয়েক সপ্তাহে কোরিয়ান ওন, জাপানি ইয়েন ও তাইওয়ান ডলার ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিনিময় হার বৃদ্ধির দিক থেকে এ তিন এশীয় মুদ্রা চলতি বছরে এখন পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় পারফরম্যান্স বজায় রেখেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দেশগুলো কীভাবে মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করবে সেটি শুল্ক কমানোর আলোচনায় উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে থাকবে।

এ বিষয়ে সিটিগ্রুপের এশিয়া-প্যাসিফিক ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রেডিং বিভাগের প্রধান নাথান ভেঙ্কট স্বামী বলেন, ‘বাজারে এ ধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে মুদ্রার বিনিময় হার সম্পর্কিত কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করবে।’

এক চীনা বিনিয়োগকারী বলেন, ‘বিনিময় হার আলোচনার অংশ হবে। বাজার সে আলোচনার আগেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে।’

এশিয়ার রফতানিকারক দেশগুলোর তালিকায় সামনের দিকে অবস্থান তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের। এসব দেশে থাকা ডলারের বড় রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশগুলোর সম্ভাব্য বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে জল্পনা উসকে দিচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের এশিয়া ম্যাক্রো রিসার্চের সহপ্রধান টিমোথি মোর মতে, এশীয় মুদ্রার শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা এতদিন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চেপে ধরা হয়েছিল। এখন অনুকূল পরিবেশে বিনিময় হার বৃদ্ধিতে এর প্রকৃত মূল্য দেখা যাচ্ছে।

১৯৮৫ সালের প্লাজা অ্যাকর্ড নামের বহুপক্ষীয় মুদ্রা চুক্তি সম্পন্ন হয়। যেখানে জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ডলারের অবমূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে অনেক ট্রেডার ও বিশ্লেষক মনে করছেন, এবার প্লাজা অ্যাকর্ড ধাঁচের বহুপক্ষীয় মুদ্রা চুক্তির পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা কম।

বাজার প্রত্যাশা করছে একক বহুপক্ষীয় চুক্তির বদলে একাধিক ছোট ছোট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা সহজ হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের এফএক্স স্ট্র্যাটেজি বিভাগের সহপ্রধান মীরা চন্দন বলেন, ‘একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্ভবত বেশি সহজ।’

গত সপ্তাহে মার্কিন ডলারের বিপরীতে কোরিয়ান ওনের বিনিময় হার ২ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তখন জানা গিয়েছিল, চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া।

এর আগে তাইওয়ান ডলারে নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, যার আংশিক কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা। এ সময় বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি, যা একটি নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন বলেছিল, এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।

তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের মধ্যে ক্রমেই এ ধারণা বাড়ছে, মুদ্রার ওপর সীমিত হস্তক্ষেপকে বাণিজ্য চুক্তির শর্ত হিসেবে তুলে ধরতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

আঞ্চলিক ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রেডাররা ধারণা করছেন, স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা। তাইওয়ানের লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, চলতি মাসের মতো এক লাফে বিনিময় হার অনেক বেশি বাড়বে না। বরং ধীরে ধীরে বাড়ার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। গত বুধবার তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ইয়েন জুং-টা জানান, স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হারের হঠাৎ অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের প্রধান চিন্তা।

বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের ইয়েন ও চীনের রেনমিনবি আঞ্চলিক বিনিময় হারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছে, বিনিময় হার বাজারের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত এবং বর্তমান ডলার-ইয়েনের বিনিময় হার অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

জাপানই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক আলোচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রবেশ করেছিল। অবশ্য গাড়ির ওপর থেকে ২৫ শতাংশ শুল্ক কমানোর চেষ্টায় এখনো ফল আসেনি। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নোমুরার প্রধান এফএক্স স্ট্র্যাটেজিস্ট ইউজিরো গোতো জানান, যুক্তরাষ্ট্র এ শুল্কহার ১০ শতাংশে নামাতে রাজি হতে পারে। এ বোঝাপড়ার ভিত্তি হতে পারে, টোকিও ইয়েনের ৩-৫ শতাংশ বিনিময় হার বৃদ্ধি ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করবে না।

অন্যদিকে চীনের রেনমিনবির ক্ষেত্রে গোল্ডম্যান স্যাকস এখন পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী ১২ মাসে ১ ডলারের বিনিময়ে ৭ ইউয়ান পাওয়া যাবে। বর্তমানে ১ ডলারে পাওয়া যায় ৭ দশমিক ২০ ইউয়ান। গোল্ডম্যান স্যাকসের টিমোথি মো বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে বাজার ধীরে ধীরে রেনমিনবির বিনিময় হার বৃদ্ধি অনুমোদন করতে পারে। এতে ইয়েন, ওন ও তাইওয়ান ডলারের মতো অন্যান্য মুদ্রার বিনিময় হার বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

আরও